পূর্ণিমা ছবিরানী মহিমা_এভাবেই সেদিন বাড়ে সম্ভ্রমহারাদের সারি

মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ (৩)
তপন বিশ্বাস ॥ ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াত জোটের নরপিশাচরা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ধর্ষণে মেতে ওঠে। প্রতিহিংসার রাজনীতিতে মানবতা লাঞ্ছিত হয়। এদের সংঘটিত হত্যা, ধর্ষণ, সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদ, সম্পদ লুণ্ঠন, জোরপূর্বক চাঁদা আদায়, শারীরিক নির্যাতন ও অগ্নিসংযোগের মতো অসংখ্য ঘটনায় মানবতা ক্রন্দনরত। এ জাতীয় আরও কিছু ঘটনা তুলে ধরা হলো ধারাবাহিকের এই সংখ্যায়।
২০০১ সালের ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনোত্তর খুন, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, অগ্নিসংযোগসহ সব মানবতাবিরোধী সহিংসতায় আক্রান্ত নিরীহ ব্যক্তি ও পরিবারের শোক, দুঃখ ও বেদনার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন। অনেকে তদন্ত কমিশনের সামনে এসে বর্ণনা করেছে লোমহর্ষক কাহিনী। আবার কেউবা ভয়ে এখনও মুখ খুলতে সাহস পায়নি। নাম প্রকাশ না করেও কেউ কেউ ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে তদন্ত কমিশনের সামনে।

এক পরিবারের তিন সংখ্যালঘু নারীর সম্ভ্রমহানি ॥ বরিশাল সদর থানার চরমোনাই ইউনিয়নের রাজারচর গ্রামে তিন সংখ্যালঘু নারীকে ধর্ষণ করে নরপিশাচরা। তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে, রাজারচর গ্রামের পবিত্র কুমার মিস্ত্রি হোগলাপাতার ব্যবসা করত। দুই ছেলে, দুই মেয়ে, বোন আর স্ত্রীকে নিয়ে সে বসবাস করত। নির্বাচনের পর গ্রামে সন্ত্রাসীদের দাপট বেড়ে যাওয়ায় বড় মেয়ে গৌরীকে শহরে পাঠিয়ে দেয়। এতে বড় মেয়ে রক্ষা পেলেও সম্ভ্রম রক্ষা করতে পারেনি পরিবারের অন্য নারীরা। ২০০১ সালের ১০ অক্টোবর সকাল ১১টার দিকে বিএনপি সন্ত্রাসী বজলু, পিতা- মকবুল হাওলাদার, আতাহার তালুকদার, পিতা অজ্ঞাত উভয় সাং রাজারচর, থানা-কোতোয়ালি, বরিশালসহ ১০-১২ অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসী পবিত্র কুমারের বাড়িতে এসে তাকে না পেয়ে স্ত্রী-সন্তানদের পরনের কাপড় ছাড়া বাকি মালামাল লুট করে নিয়ে যায় এবং পবিত্রকে দেখা করতে বলে। কিন্তু প্রাণভয়ে পবিত্র দেখা না করলে সন্ত্রাসীরা ১৩ অক্টোবর রাত সোয়া ১টার দিকে সিঁধ কেটে তার ঘরে প্রবেশ করে দরজা ভেঙ্গে ফেলে। এ সময় সন্ত্রাসীরা ঘরে ঢুকে পবিত্রর স্ত্রী পারুল বালা (৪০), মেয়ে প্রিয়ঙ্কা রানী মিস্ত্রি (পুষ্প) (১৪), চাচাত বোন সোমা রানী মিস্ত্রিকে গণধর্ষণ করে। ঘটনার দীর্ঘ ৯ বছর পর ভিকটিমরা তদন্ত কমিশনের কাছে এ ঘটনা প্রকাশ করেছে। ঘটনার সময় থানায় মামলা দায়ের করা হলেও আসামিরা থেকে যায় ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

কিশোরী পূর্ণিমাকে গণধর্ষণ ॥ পনেরো বছর বয়সের দশম শ্রেণীর ছাত্রী পূর্ণিমা গণধর্ষণের শিকার হয়ে অনেকটা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। সিরাজগঞ্জের উলস্নাপাড়া থানার দেলুয়া গ্রামের অনিল কুমার শীলের পরিবারের ওপর ২০০১ সালের নির্বাচন পরবর্তী অক্টোবর মাসের ৮ তারিখ রাতে চালানো হয় বর্বরতম অত্যাচার-নির্যাতন-নিপীড়ন। রাতে জোরপূর্বক বাড়িতে ঢুকে অত্যাচার-নির্যাতনের এক পর্যায়ে সন্ত্রাসীরা অনিল শীলের ছোট মেয়েকে তুলে নিয়ে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। ঘটনার ৩/৪ দিন পর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ধর্ষিত ছাত্রী ও তার পরিবারকে সাংবাদিদের সামনে হাজির করলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।

কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০১ সালের ৮ অক্টোবর বিএনপি-জামায়াত জোটের সন্ত্রাসী মোঃ খলিল মিয়া, মোঃ আঃ জলিল মিয়া, মোঃ লিটন মিয়া, মোঃ আলতাফ হোসেন, মোঃ আনোয়ার হোসেন, মোঃ রেজাউল হক, মোঃ আঃ মালেক, মোঃ হোসেন আলী, মোঃ ছাবেদ আলী, মোঃ আঃ রউফ, মোঃ আঃ মান্নান, মোঃ মজনু, মোঃ ইউসুফ আলী মোঃ মমিন হোসেন, মোঃ মনসুর আলী, মোঃ জহুরুল ইসলাম, মোঃ মেভেন মিয়া, মোঃ ইয়াসিন আলী, মাঃ আব্দুল মিয়া, মোঃ বাবুল মিয়াসহ ২৫-৩০ জনের একটি সন্ত্রাসী দল রাতের অাঁধারে অনিল শীলের বাড়িতে হানা দেয়। তারা অনিলের ছোট মেয়ে পূর্ণিমা রাণী শীলকে অপহরণ করতে গেলে তার স্ত্রী বাধা দিতে আসে। কিন্তু সন্ত্রাসীদের হামলায় পূর্ণিমার মা অজ্ঞান হয়ে পড়ে। বাড়ির সবাইকে মারধর করে তারা পুর্নিমাকে তুলে নিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করে।

উল্লাপাড়া হামিদা উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীৰার্থিনী পূর্ণিমা ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন নিজ গ্রাম দেলুয়া ভোটকেন্দ্রে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আব্দুল লতিফ মির্জার নির্বাচনী এজেন্ট ছিল। তার মা বাসনা অন্য ভোটকেন্দ্র মহিলা আনসারের দায়িত্ব পালন করছিলেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার কারণে এই পরিবারের ওপর নেমে আসে বিএনপি-জামায়াত জোটের সন্ত্রাসীদের এই পাশবিক অত্যাচার। অবশ্য এ ঘটনায় কয়েকজনের শাস্তিও হয়েছে।

ছবি রানী ধর্ষণ ॥ তদন্ত কমিশন সরেজমিন তদনত্ম করতে গেলে বাগেরহাট সার্কিট হাউসে এসে নির্মম নির্যাতনের কাহিনী বর্ণনা করে গণধর্ষণের শিকার হওয়া ছবি রানী। ধর্ষণের সময় তার বয়স ছিল ২০ বছর। ছবি রানী কমিশনের সামনে বলে, ২০০২ সালের ২১ আগস্ট বিএনপি নেতা মল্লিক মিজানুর রহমান ওরফে মজনু ও বাশার কাজীর নির্দেশে সন্ত্রাসী মজনু রহমান (বিএনপি থানা আহ্বায়ক), আবুল বাসার, তায়েব নুর, কামাল শিকারী, কামাল ইজারাদার, বজলুর রহমান, পলাশ, মাঝে শিকদার, ইল ফরাজী, হিমু কাজী, জিন্না নুর প্রহরী, ইমদাদ, এমএ মান্নান, হারুন মল্লিক, মোসত্মাফিজুর রহমান, হাফিজ উদ্দিন, আলতাফরা সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টা থেকে সাড়ে ৭টায় তাকে বিএনপি অফিসে ডেকে নিয়ে গণর্ধষণ করে। পরে মাথার চুল কেটে দেয়। পরে নগ্ন ছবি করে যৌনাঙ্গে বালু ও কাঁচের গুঁড়া ঢুকিয়ে দেয়। পানি খেতে চাইলে প্রসাব করে তা খেতে দেয়। জবানবন্দী দেয়ার সময় তার শরীরের কয়েকটি চিহ্ন কমিশনের সদস্যদের দেখান। এ সময় ছবি রানী তদন্ত কমিশনকে জানায়, বাগেরহাট আদালতে এ মামলা চলাকালে বিএনপির তখনকার সভাপতি ও বাগেরহাট-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এমএএইচ সেলিম তাঁর বাগেরহাটের বাড়িতে ডেকে নিয়ে জোর করে মামলা মীমাংসাপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে নেয় এবং সন্ত্রাসীর হুমকির মুখে সাক্ষী হাজির করতে না পারায় বাধ্য হয়ে মামলাটি প্রথমে ঢাকা, পরে খুলানা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করে।

ধর্ষিত কিশোরী মহিমার আত্মহনন ॥ ঘটনাস্থল রাজশাহীর পুঠিয়া। কাঁঠালবাড়ীয়া গ্রামের আঃ হান্নানের ১৪ বছরের মেয়ে মোছাঃ মহিমা খাতুন। ২০০২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিকেলে নিজ বসতবাড়ির পূর্বপাশ্বের একটি কাঁঠাল গাছ থেকে পাতা পেড়ে ছাগলকে খাওয়ানোর সময় বিএনপি সমর্থিত সন্ত্রাসী ফরিদ, পিতা- সেকেন্দার, ফারুক, পিতা-মোতালেব, সেলিম, পিতা- খলিল, সাং সেনবাগ, উজ্জল, পিতা-মোশারফ, সাং-পীরগাছা, মোশারফ হোসেন, পিতা-জবেদ আলী, সেকেন্দার আলী, পিতা- মৃত মাহাতাব, আঃ মোতালেব, পিতা- মৃত সৈয়দ আলী উভয় সাং কাঁঠালবাড়ীয়া ও খলিল, পিতা- লোকমান, সাং বড় সেনবাগ পুঠিয়া তাকে জোরপূর্বক পার্শবর্তী আবু বক্করের আখক্ষেতে নিয়ে যায় এবং আসামিরা তাকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। পরে সন্ত্রাসীরা মহিমা খাতুনের বিবস্ত্র অবস্থায় ছবি তোলে। ঘটনাটি প্রথমে আপোস মীমাংসার চেষ্টা চলে। কিন্তু স্থানীয়ভাবে আপোস মীমাংসা না হওয়ায় মহিমা খাতুন সম্ভ্রমহানির অপমানে ঘটনার চারদিনের মাথায় ১৯ ফেব্রুয়ারি বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিষপান করে । সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
সূত্র: দৈনিক জনকণ্ঠ ১৪ জুন ২০৩৩

1 comment:

  1. Islam is a curse for human civilization

    ReplyDelete